হাওজা নিউজ এজেন্সি: মহররমের শোকাবহ দিনগুলোতে ইতিহাস ও আকিদাসংক্রান্ত আলোচনায় একটি প্রশ্ন বারবার উত্থাপিত হয়— কারবালার ঘটনায় কুফাবাসী এবং তথাকথিত “শিয়াদের” কোনো ভূমিকা ছিল কি না। এই সংশয়টির ঐতিহাসিক ও কালামভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন রেজা মোহাম্মদী শাহরুদী উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এই প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেন। তাঁর বক্তব্য নিম্নরূপ—
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
কিছু লোক বলে থাকে, প্রতিটি যুগের মানুষ তাদের সময়ের নেতার অনুসারী হয়ে থাকে। সুতরাং কুফার মানুষ যেহেতু আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.)-এর শাসনামলে বেড়ে উঠেছিল এবং তাঁর শাসনাধীন ছিল, তাই তারা তাঁর শিয়া ছিল। অতএব, কারবালায় ইমাম হুসাইন (আ.)-কে তাঁর নিজের শিয়ারাই হত্যা করেছে। তাহলে কেন শুধু শিমার, ইয়াজিদ এবং বনু উমাইয়াকে অভিশাপ দেওয়া হয়? অন্তত শিয়ারাও তো এই ঘটনায় ভূমিকা রেখেছিল।
এই বক্তব্য কয়েকটি দিক থেকে ভুল
প্রথমত, “প্রত্যেক যুগের মানুষ তাদের সময়ের নেতার অনুসারী”— এর অর্থ কী?
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তিকালের পর কি মানুষের প্রকৃত নেতা আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.) ছিলেন না? তাহলে কি সবাই তাঁর অনুসারী হয়েছিল?
সাকিফায় কতজন আবু বকরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং কতজন তাঁর বিরোধিতা করেছিল?
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর যুগের প্রকৃত ইমাম ছিলেন হযরত আলী (আ.)। কিন্তু তাঁর চারপাশে যারা সমবেত হয়েছিলেন, তাদের সংখ্যা হাতের আঙুলে গোনা যেত।
কুফায় তাঁর শাসনামলেও প্রকৃত অর্থে কতজন তাঁর সঙ্গে ছিল?
ইমাম আলী (আ.) বলেছিলেন— “আমি তোমাদের দশজনকে দিয়ে শামের একজনকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত আছি।”
কেন তিনি এমন কথা বলেছিলেন?
কারণ বাস্তবতা এমন ছিল যে, আনুগত্য, শৃঙ্খলা ও দৃঢ়তার বিচারে একজন শামী সৈনিক কুফার বহু সৈনিকের সমতুল্য ছিল।
তাহলে কি এরা তাঁর অনুসারী ছিল?
এরা কি তাঁরই লালিত-পালিত জনগোষ্ঠী ছিল না?
খারিজিরা কারা ছিল?
তারা কি ইমাম আলী (আ.)-এর সেনাবাহিনীর সদস্য ছিল না?
শেষ পর্যন্ত তারাই কি তাঁকে শহীদ করেনি?
তাহলে কি এ ধরনের লোকদের আমিরুল মুমিনীন (আ.)-এর প্রকৃত অনুসারী বলা যায়?
ইমাম আলী (আ.)-এর একটি দীর্ঘ ভাষণ রয়েছে, যার খুব অল্প একটি অংশ নাহজুল বালাগার দ্বিতীয় খুতবায় স্থান পেয়েছে; অথচ মূল ভাষণটি প্রায় বারো থেকে তেরো পৃষ্ঠাব্যাপী।
সেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে, লোকেরা তাঁকে প্রশ্ন করত— “আপনি অমুক কাজটি কেন করছেন না? কেন পূর্ববর্তী শাসকদের প্রবর্তিত পরিবর্তনগুলো সংশোধন করছেন না? কেন যেসব বিষয় পরিবর্তিত হয়েছে, সেগুলোকে নববী সুন্নাহ অনুযায়ী ফিরিয়ে আনছেন না?”
এর জবাবে তিনি মিম্বারে উঠে ভাষণ দেন এবং একটি পত্র লিখে জুমার নামাজে তা পাঠ করার নির্দেশ দেন।
তিনি বলেন— “রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তিকালের পর শাসকগণ বড় বড় পরিবর্তন ঘটিয়েছে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে রাসূলের সুন্নাহ ভঙ্গ করেছে এবং ইসলামের মূল পথ থেকে বিচ্যুতি সৃষ্টি করেছে।”
এরপর তিনি এ ধরনের ত্রিশটি বিচ্যুতির উল্লেখ করেন।
পরে তিনি বলেন— “তোমরা কি চাও আমি এগুলো সংশোধন করি এবং আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনি? যদি আমি তা করি, তাহলে আমার চারপাশে যারা রয়েছে এবং আমার সঙ্গে যুদ্ধ করছে, তারাই আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে এবং শেষ পর্যন্ত আমাকে হত্যা করবে।”
তাহলে কি এরা প্রকৃত অর্থে তাঁর অনুসারী ছিল?
তিনি আরও বলেন, ঐ ত্রিশটি বিষয়ের মধ্যে একটি মাত্র পরিবর্তন করলেও তাঁর নিজের লোকেরাই বিদ্রোহে নেমে আসত।
একবার কুফাবাসীরা তাঁর কাছে এসে একজন ইমাম জামাত নিয়োগের অনুরোধ জানাল।
তারা বলল— “আমাদের জন্য একজন ইমাম নির্ধারণ করুন, যিনি আমাদের নামাজ পড়াবেন।”
ইমাম আলী (আ.) বললেন— “রমজান মাসের নফল নামাজ জামাতে আদায় করা বিদআত এবং তা বৈধ নয়।”
এরপর তাঁর নিজের সেনাবাহিনীর মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে স্লোগান উঠতে শুরু করে।
তিনি ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)-কে বললেন— “গিয়ে দেখো, তারা কী বলছে।”
ইমাম হাসান (আ.) ফিরে এসে বললেন— “তারা আপনার বিরুদ্ধেই স্লোগান দিচ্ছে।”
তখন ইমাম আলী (আ.) বললেন— “যদি তোমরা পূর্ববর্তীদের প্রচলিত পদ্ধতি বজায় রাখতে চাও, তাহলে তোমরাই নিজেদের ইমাম নির্বাচন করো এবং নামাজ আদায় করো।”
এখন প্রশ্ন হলো— এদের কি সত্যিই ইমাম আলী (আ.)-এর অনুসারী বলা যায়?
ইমাম আলী (আ.)-এর পত্র ও খুতবাগুলো পড়লে দেখা যায়, তিনি এসব মানুষের আচরণ নিয়ে কত গভীর বেদনা প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেছেন—
يا أشباه الرجال ولا رجال
অর্থাৎ— “হে পুরুষের আকৃতিধারী লোকেরা, অথচ তোমরা প্রকৃত পুরুষ নও!”
তিনি আরও বলেছেন, “তোমরা আমার হৃদয়কে রক্তাক্ত করে দিয়েছ।”
তাহলে কি এদের তাঁর প্রকৃত অনুসারী বলা যায়?
দ্বিতীয়ত, আপনারা যদি এই ভিত্তি গ্রহণ করেন যে প্রত্যেক যুগের মানুষ তাদের সময়ের নেতার অনুসারী, তাহলে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর যুগে মানুষের অনুসরণ করার কথা ছিল ইমাম হুসাইন (আ.)-কে, ইমাম আলী (আ.)-কে নয়।
ইমাম আলী (আ.)-এর শাহাদাত এবং কারবালার ঘটনার মধ্যে প্রায় বিশ বছর ব্যবধান ছিল। সেই প্রজন্ম চলে গিয়েছিল এবং নতুন প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটেছিল।
অতএব, এই যুক্তি মেনে নিলেও— যদিও এই ভিত্তিটিই ভুল— মানুষের অনুসারী হওয়ার কথা ছিল ইমাম হুসাইন (আ.)-এর।
এখন প্রশ্ন হলো— তারা কি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর অনুসারী ছিল, নাকি ইয়াজিদের?
যদি বলা হয় ইয়াজিদই তাদের নেতা ছিল, তাহলে ইসলামের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আর কিছু বলার থাকে না।
একই যুক্তি অনুযায়ী, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর যুগের মানুষের তাঁর আনুগত্য করা উচিত ছিল।
কিন্তু তারা কেন তা করেনি?
ত্রিশ হাজার সৈন্য এসে শতাধিকেরও কমসংখ্যক একটি দলকে অবরুদ্ধ করেছিল।

“কারবালায় শিয়ারা উপস্থিত ছিল”— এই দাবির বিশ্লেষণ
কিছু মানুষ দাবি করে যে কারবালায় শিয়ারাও উপস্থিত ছিল। এটি একটি অযৌক্তিক ও অবিচারপূর্ণ দাবি।
প্রথমে আমাদের নির্ধারণ করতে হবে— শিয়া বলতে কী বোঝায়?
কিছু ওহাবি দৃষ্টিভঙ্গিতে যে কেউ তাদের মতের বিরোধিতা করে, তাকেই “শিয়া” বলা হয়— সে সুন্নি হোক বা অন্য কোনো মতের অনুসারী।
এমনকি কেউ কেউ মু'তাযিলাদেরও শিয়া বলে থাকে, যদিও তারা ইমামতের আকিদায় বিশ্বাস করে না; বরং তারা যুক্তিবাদ ও ন্যায়বাদের প্রবক্তা।
অতএব, “শিয়া” শব্দের ব্যবহার সবসময় একই অর্থে হয় না।
কিছু মতবাদে এমনও বলা হয় যে, চার খলিফার মধ্যে যদি কেউ হযরত আলী (আ.)-কে অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করে, তবে তাকেও “শিয়া” বলা হয়— যদিও সে চারজনকেই খলিফা হিসেবে স্বীকার করে।
কিন্তু যদি “শিয়া” বলতে দ্বাদশ ইমামে বিশ্বাসী ইসনা আশারিয়া শিয়াদের বোঝানো হয়, তাহলে বলা যায়— কারবালার প্রান্তরে উমর ইবনে সাদের বাহিনীতে একজনও ইসনা আশারিয়া শিয়া ছিল না।
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে— “সমগ্র ইসলামী বিশ্বে আমাদের প্রকৃত শিয়ার সংখ্যা তিনজনেরও কম।”
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে— “সমগ্র হিজাজ অঞ্চলে আমাদের প্রকৃত বন্ধু বিশজনও নেই।”
তাহলে কীভাবে বলা যায় যে তারা শিয়া ছিল?
শিয়া কি কখনো নিজের ইমামকে হত্যা করতে পারে?
শিয়া কি নিজের ইমামের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে পারে?
শিয়ার সংজ্ঞা
শিয়া হলো সেই ব্যক্তি, যে আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.) এবং তাঁর এগারোজন নিষ্পাপ উত্তরসূরি ইমামের অনুসারী ও অনুগত।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামী কালামশাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—
مُحارِبُ الإمامِ كافِرٌ، ومُخالِفُهُ فاجِرٌ
অর্থাৎ— “যে ইমামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সে কাফির, আর যে তাঁর বিরোধিতা করে সে পাপাচারী।”
অতএব, শিয়াদের দৃষ্টিতে ইমামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ঈমান ও আনুগত্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
যারা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তাঁকে শহীদ করেছে, তাঁর তাঁবুতে আগুন দিয়েছে এবং তাঁর পরিবারকে বন্দি করেছে— তাদের কি শিয়া বলা যায়?
সুতরাং উমর ইবনে সাদের বাহিনীতে একজনও প্রকৃত শিয়া ছিল না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আমিরুল মুমিনীন (আ.) এবং তাঁর পবিত্র বংশধর ইমামদের প্রকৃত অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।
الحمد لله الذي جعلنا من المتمسكين بولاية أمير المؤمنين وأولاده الطاهرين والأئمة المعصومين عليهم السلام
অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদেরকে আমিরুল মুমিনীন এবং তাঁর পবিত্র সন্তান ও নিষ্পাপ ইমামদের বেলায়ের অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।”
আল্লাহ আমাদের সকলকে এই ভালোবাসা, আনুগত্য ও সত্যনিষ্ঠার ওপর অটল রাখুন।
আপনার কমেন্ট